লেখক মোঃ সাইদুল বাসারঃ প্রাঙ্গণে রক্ত আর একলা নাগরিকের পলায়নপরতা।
সভ্যতার লেবাস গায়ে চাপিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত এক পলায়নপর যুগের দিকে হেঁটে চলেছি। রাজপথ থেকে অলিগলি—কোথাও কোনো চিৎকার শুনলেই আমাদের পায়ের গতি যেন রহস্যজনকভাবে দ্বিগুণ হয়ে যায়। কে কার টুঁটি টিপে ধরল, কে কার রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে সাম্রাজ্য গড়ল, তাতে আমাদের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। আমাদের আধুনিক মনস্তত্ত্ব আজ এতটাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে যে, চোখের সামনে একটি তাজা প্রাণ ঝরে পড়লেও আমরা স্মার্টফোনের স্ক্রিনে চোখ ডুবিয়ে হেঁটে যাওয়াকে বেশি নিরাপদ মনে করি। এই নীরব প্রস্থান শুধু এক কাপুরুষতা নয়, এটি একটি সামগ্রিক সামাজিক পচন, যা আমাদের ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
গতকাল ঘটে যাওয়া রক্তক্ষয়ী ট্র্যাজেডিগুলো আমাদের এই নগ্ন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যখন জাকারিয়ার মতো কোনো প্রতিবাদী বা সাহায্যপ্রার্থী মানুষ অন্যের বিপদে বুক চিতিয়ে সামনে দাঁড়ায়, তখন সমাজ তাকে আগলে রাখার বদলে উল্টো এক নিঃসঙ্গ দ্বীপে ফেলে দেয়। পরবর্তীতে তার নিথর দেহ যখন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, তখন চারপাশের তথাকথিত ভদ্রসমাজ মোমবাতি প্রজ্বলনের ভান ধরে। অথচ এই অন্ধকারের সৃষ্টির পেছনে আমাদের সবার সম্মিলিত নীরবতাই দায়ী। অপরাধীরা যখন দেখে যে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠার বদলে ঘরের কোণে লুকিয়ে থাকে, তখন তাদের আস্ফালন আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। আমরা নিজের অজান্তেই এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হতে দিই, যেখানে প্রতিবাদ করার অপরাধে জাকারিয়াদের মতো মানুষকে জীবন দিয়ে নির্মম মূল্য চুকাতে হয়।
সমাজের কাঠামোর দিকে তাকালে এই পলায়নপরতার মূল কারণ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্থানীয় ক্ষমতার বলয় এবং পেশিশক্তির অপব্যবহার—সব মিলিয়ে নাগরিক নিরাপত্তা আজ কেবল একটি কাগজে কলমে থাকা প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হয়েছে। অপরাধী যখন বিভিন্ন গোত্রীয় বা প্রভাবশালী ছত্রছায়ায় অনায়াসে পার পেয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষের মনে সমাজের প্রতি যে আস্থার দেয়াল ছিল, তা মুহূর্তে ধসে পড়ে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে মানুষ এখন আর ন্যায়ের পক্ষে কথা বলার কথা ভাবতেও সাহস পায় না। তারা বুঝে গেছে, ন্যায়বিচার কেবল ক্ষমতার বলয়ে থাকা কতিপয় মানুষের জন্য সংরক্ষিত, সাধারণের ভাগ্যে জুটে কেবল বঞ্চনা আর দীর্ঘশ্বাস। এই আস্থার সংকট সমাজকে দিন দিন আরও বেশি অসংগঠিত ও বিপন্ন করে তুলছে।
জাকারিয়ার মৃত্যু আমাদের সামনে এক নির্মম আয়না ধরে দিয়েছে, যা আমাদের প্রতিদিনের আত্মতুষ্টির মুখোশটি চিরতরে খুলে দিয়েছে। আমরা এমন এক সমাজে বসবাস করছি যেখানে নিঃস্বার্থভাবে কারো উপকার করতে গেলেই মৃত্যুকে বরণ করে নেওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়। পাড়া-মহল্লার মোড়ে মোড়ে এখন কেবল আতঙ্কের দীর্ঘশ্বাস। এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসার জন্য কেবল আবেগপ্রবণ লেখালেখি যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন অন্তরের গভীরে গিয়ে শুভবুদ্ধির উদ্রেক ঘটানো। মানুষ যদি মানুষের দুর্দিনে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে সেই সমাজকে কোনোভাবেই সভ্য বলা চলে না। জাকারিয়ার রক্ত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অন্যায়ের সামনে এভাবে মাথা নত করে বেঁচে থাকার চেয়ে সম্মিলিতভাবে রুখে দাঁড়ানো অনেক বেশি সম্মানজনক।
তাই সময় এসেছে আত্মসমালোচনার আয়নায় নিজের মুখ দেখার এবং ঘুমন্ত বিবেককে নাড়া দেওয়ার। শুধু শোকসভা, ফেইসবুক স্ট্যাটাস বা গালভরা বিবৃতি দিয়ে এই পচাগলা ব্যবস্থার মুক্তি মিলবে না। জাকারিয়া হত্যার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের সামাজিক ও নৈতিকভাবে বয়কট করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেই নিজেদের সুরক্ষার বলয় তৈরি করতে হবে। ভয়াল এই পলায়নপর সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসার একমাত্র পথ হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে দুর্ভেদ্য প্রাচীর গড়ে তোলা। আমাদের এমন এক সমাজ বিনির্মাণ করতে হবে, যেখানে জাকারিয়ার মতো মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানে নিশ্চিত মৃত্যু নয়, বরং মনুষ্যত্বের সবচেয়ে বড় বিজয় হিসেবে বিবেচিত হবে।
মোঃসাইদুল বাসার