কিশোর মানেই সমাজের আলো, কিশোরই শক্তি!
আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক এবং আলোচিত একটি শব্দ ‘কিশোর গ্যাং’। রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে মফস্বল শহর—সবখানেই আজ উঠতি বয়সী কিশোরদের হাতে মারামারি, অস্ত্রের মহড়া কিংবা চাঞ্চল্যকর অপরাধ সংঘটিত হওয়ার খবর শিরোনাম হচ্ছে।গতকাল সাতক্ষীরায় কিশোর গ্যাংয়ের হাতে জাকারিয়া খান নামের এক যুবকের নির্মম খুন হওয়ার ঘটনা আমাদের এই ক্ষতটিকে আবারও নির্মমভাবে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।সাতক্ষীরা গুরপুকুরে মেলায় উদ্বোধনের তিনদিনের মধ্যে দুইদিন কিশোরগ্যাং উৎপাত।
প্রশ্ন হলো, যে বয়সে যুবকদের হাতে কলম, বই আর খেলাধুলার ব্যাট থাকার কথা, সেই বয়সে তারা কেন আজ অপরাধের অন্ধকার জগতে পা বাড়াচ্ছে?
কিশোর গ্যাং সমস্যা শুধু সাতক্ষীরায় নয় বরং সারা বাংলাদেশ ব্যাপী মহামারীর আকার ধারণ করেছে।
কিশোর গ্যাং কালচার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের সামাজিক অবক্ষয় ও কাঠামোগত সংকটের ফসল।
এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক ‘বড় ভাইদের’ মাফিয়াতান্ত্রিক স্বার্থ রক্ষায় এই খুদে কিশোরদের পদাতিক বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারে তাদের ব্যবহার করা হলে কিশোররা একধরনের ভুল আত্মবিশ্বাস ও ক্ষমতার মোহ পেয়ে বসে।
পাড়ায় খেলার মাঠ, লাইব্রেরি কিংবা সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা না থাকায় এবং প্রযুক্তির অপব্যবহারের ফলে কিশোররা বিপথগামী হচ্ছে।
কর্মব্যস্ত বাবা-মায়েরা সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের খোঁজ না রেখে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ফলের পেছনে ছোটান। ফলে পরিবারে অবহেলিত কিশোররা বাইরের মাস্তানদের আড্ডায় আশ্রয় খোঁজে।
কোরআন ও হাদিসের আলোকে কিশোর অপরাধ ও অসৎ সঙ্গ
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে সৎকাজে একে অপরকে সহায়তার নির্দেশ দিয়ে স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করতে। সুরা আল-মায়েদার ২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে— তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সাহায্য করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সাহায্য করো না।
সুরা আত-তাহরীমের ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন— হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো। অর্থাৎ সন্তানদের নৈতিক অবক্ষয় থেকে বাঁচানো অভিভাবকদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় দায়িত্ব।
দুনিয়ায় কিশোর গ্যাং বা মাফিয়া চক্রে যেসব সঙ্গী অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, আখেরাতে তাদের সম্পর্কে কোরআনে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে কিয়ামতের দিন এই অসৎ সঙ্গীরাই একে অপরের শত্রু হয়ে দাঁড়াবে (সুরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ৬৭)।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, আগামী তিন মাসের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে কিশোর গ্যাং উৎখাত করা হবে। কিশোরদের অপরাধের পথ থেকে ফিরিয়ে লেখাপড়া ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দেওয়া হবে।
কিশোর গ্যাংগুলো মূলত রাষ্ট্রের কাঠামোগত সন্ত্রাসের প্রতিবিম্ব এবং ভয়ের সংস্কৃতির ক্ষুদ্র সংস্করণ। যখন সমাজ একজন তরুণের সামনে উন্নতির সঠিক পথ ও সুযোগের পরিবর্তে বৈষম্য ও বাধা দেয়, তখন রাস্তার গ্যাংগুলো তাদের কাছে বিকল্প সমাজ হয়ে ওঠে। মারপিট বা আধিপত্য বিস্তার তাদের জমাট বাঁধা হতাশা নিষ্কাশনের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
এ বিষয়ে ছাত্রসংগঠনগুলোর দায়িত্বশীলরাও সরব হয়েছেন। যেমন—সাতক্ষীরা পৌর ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ইমাদুল হক ছোট বাবু মন্তব্য করেছেন যে, নেশাগ্রস্ত, বেকার ও উশৃঙ্খল উঠতি বয়সী বেয়াদবরা সমাজের বোঝা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে বা ক্যাম্পাসে কিশোর গ্যাং যেন কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে ছাত্রদল কঠোর ও সজাগ রয়েছে।
কেবল পুলিশি শাসন বা গণহারে কিশোরদের দৌড়ানির ওপর রাখলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। সমস্যার শিকড় উৎপাটনে
রাজনীতির অপরাধীকরণ বন্ধ করতে হবে।কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্য কারিগর ‘বড় ভাইদের’ বা বিগ ব্রাদারদের ক্ষমতার পাইপলাইন কেটে দিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজ উদ্যোগে এ ধরনের অপরাধীদের প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করতে হবে।
ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার শহরে ১৯ শতকে যুবকদের ক্লাবের মাধ্যমে যেভাবে ফুটবল উন্মাদনার জোয়ার এনে গ্যাং সংস্কৃতি দমন করা হয়েছিল, তেমনি আমাদের প্রতিটি পাড়ায় ক্লাব, লাইব্রেরি ও খেলার মাঠ ফিরিয়ে আনতে হবে।
সন্তানদের প্রতি অভিভাবকদের বন্ধুসুলভ আচরণ বাড়াতে হবে এবং তাদের ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
পথভ্রষ্ট কিশোরদের অপরাধের পথ থেকে ফিরিয়ে এনে কারিগরি শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে হবে, যাতে তারা দেশের সম্পদে পরিণত হয়।
কিশোররা সমাজ বদলানোর হাতিয়ার হতে পারে, যদি তাদের শক্তিকে সঠিক পথে চালিত করা যায়। দমন ও সংশোধনের পাশাপাশি একটি সুস্থ সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল এই অভিশাপ থেকে সমাজকে মুক্ত করা সম্ভব।