আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ফিলিপাইনে যাত্রীবাহী ফেরিতে লাগা ভয়াবহ আগুনে প্রাণহানির সংখ্যা লাফিয়ে বেড়ে ৭৬ জনে পৌঁছেছে। উদ্ধারকারীরা জলযানটি থেকে আরও ৪১ জনের পুড়ে যাওয়া দেহাবশেষ উদ্ধারের পর দেশটির কর্তৃপক্ষ শনিবার এই তথ্য নিশ্চিত করে। বর্তমানে আরও ১৩ জন যাত্রী নিখোঁজ রয়েছেন। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় পুড়ে যাওয়া দেহগুলোর পরিচয় শনাক্ত করতে ফরেনসিক দলকে এখন চরম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। শুক্রবার উদ্ধার করা ৩০টি মরদেহ প্রথম ধাপে কোরন শহরের বন্দরে নিয়ে আসা হলে সেখানে শুরু হয় পরিচয় শনাক্তকরণের জটিল ও সতর্ক প্রক্রিয়া। বন্দরে সাময়িকভাবে স্থাপন করা বিশেষ তাঁবুতে লাশগুলো নিয়ে যাওয়া হয়। সে সময় প্রতিরক্ষামূলক পোশাক পরা উদ্ধারকারীদের কোস্টগার্ডের জাহাজ থেকে একের পর এক কালো রঙের বডি ব্যাগ বের করে তাঁবুতে নিয়ে যেতে দেখা যায়। দুর্ঘটনাকবলিত প্রিয়জনদের খবরের আশায় কাছেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন স্বজনরা।
তাদেরই একজন ৩৭ বছর বয়সী আনেলিন মাগবানুয়া। ম্যানিলায় সন্তানদের সঙ্গে দেখা করে কোরনে ফেরার পথে তার স্বামী এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হন। ১৩০ জনেরও বেশি যাত্রী নিয়ে ফেরিটি ২০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা যাত্রার প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছিল, ঠিক তখনই অগ্নিকাণ্ড ঘটে। কান্নাভেজা কণ্ঠে আনেলিন বলেন, আমি আশা করছি জাহাজের ভেতর থেকে বের করে আনা মৃতদের সারিতে যেন ওনার শরীর না থাকে। ও যেন বেঁচে থাকে এবং ভেসে অন্য কোনো দ্বীপে চলে যায়। ও যদি সত্যি আমাদের ছেড়ে চলে গিয়ে থাকে, তবে তা মেনে নেওয়া আমার জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে। ও বাচ্চাদের ভীষণ ভালোবাসত। দীর্ঘ এক দিনেরও বেশি সময় পর আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এলে শুক্রবার ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা প্রথমবারের মতো ফেরিটিতে প্রবেশ করার সুযোগ পান। প্রচণ্ড তাপ ও ঘন কালো ধোঁয়ার কারণে যেসব স্থানে এত দিন পৌঁছানো অসম্ভব ছিল, সেসব জায়গায় পৌঁছাতে সক্ষম হন উদ্ধারকারীরা। কোস্টগার্ড নিশ্চিত করেছে যে ফেরির অর্থনীতি (ইকোনমি) ট্রাভেল সেকশন থেকেই বেশির ভাগ পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। কোস্টগার্ডের প্রকাশ করা ছবিগুলোতে জাহাজের ভেতরের তাণ্ডব ও ধ্বংসের ভয়াবহ রূপ ফুটে উঠেছে। তীব্র তাপে ইস্পাতের বেড ফ্রেমগুলো দুমড়ে-মুচড়ে গেছে এবং পুরো এলাকা ছাইয়ের প্রলেপে ঢেকে গেছে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে কঙ্কালের অবশিষ্টাংশ পড়ে থাকার দৃশ্যও স্থিরচিত্রে উঠে এসেছে। শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে ফিলিপাইন কোস্টগার্ডের কর্মকর্তা জেরোনিমো তুভিলা জানান, তাদের বর্তমান মূল অগ্রাধিকার হলো মৃতদের পরিচয় শনাক্ত করা এবং অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা। এদিকে, মেরিটাইম ইন্ডাস্ট্রি অথরিটির এক বিবৃতিতে সারভাইভার বা বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের বরাতে জানানো হয়েছে, আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঠিক মুহূর্তকাল আগে জাহাজের ভেতর থেকে দুটি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছিল। জিএমএ নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক বেঁচে যাওয়া যাত্রী সেই আতঙ্কের মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করে বলেন, তিনি প্রথমে সামান্য ধোঁয়া দেখতে পান, যা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তীব্র আগুনে রূপ নেয় এবং চোখের পলকে পুরো ফেরিতে ছড়িয়ে পড়ে। দুর্ঘটনার পর ফেরির ক্যাপ্টেনের ভাগ্য নিয়েও ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। একই সংবাদ সম্মেলনে কোস্টগার্ডের মুখপাত্র কমোডোর নোয়েমি কায়াবিয়াব জানান, তিনি ক্যাপ্টেন বেঁচে আছেন বলে মৌখিক তথ্য পেয়েছেন, তবে নিশ্চিতভাবে জীবিত উদ্ধার হওয়া ৪৩ জনের আনুষ্ঠানিক তালিকায় ওই ক্যাপ্টেনের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
উল্লেখ্য, ৭ হাজার ৬০০টিরও বেশি দ্বীপের দেশ ফিলিপাইনে প্রদেশ ও দ্বীপগুলোর মধ্যে যাতায়াতের জন্য কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন ফেরি ও ছোট নৌকার ওপর নির্ভর করেন। ফলে দেশটিতে একের পর এক প্রাণঘাতী নৌ-দুর্ঘটনা যেন নিত্যদিনের এক বিষাদময় বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স