অনলাইন ডেস্ক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডেটা সেন্টার নিয়ে ‘অসুস্থ ষড়যন্ত্র’ চলছে বলে অভিযোগ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দাবি, এ ধরনের ষড়যন্ত্রে একমাত্র লাভবান হচ্ছে চীন। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, এআই নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত ‘গার্ডরেল’ বা বিধিনিষেধের প্রয়োজন নেই; বরং একজন ‘শক্তিশালী ও বুদ্ধিমান’ প্রেসিডেন্টই এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এআই খাত নিয়ে চলমান বিতর্কের তীব্র সমালোচনা করেন। এ সময় তিনি অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেইসহ এআই শিল্পের কয়েকজন নেতার সাম্প্রতিক সতর্কবার্তারও সমালোচনা করেন। ট্রাম্প বলেন, এআইয়ের জন্য একমাত্র প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ বা ‘গার্ডরেল’ হলো একজন শক্তিশালী ও বুদ্ধিমান প্রেসিডেন্ট। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে সেই নেতৃত্ব রয়েছে এবং তার প্রশাসন এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ ও আইনগত ক্ষমতা রাখে। এআই নিয়ে অসুস্থ ষড়যন্ত্র
ট্রাম্প তার পোস্টে বলেন, এআই ও ডেটা সেন্টারকে ঘিরে একটি ‘অসুস্থ ষড়যন্ত্র’ চলছে। তার ভাষায়, এই পরিস্থিতিতে একমাত্র যে দেশ খুশি হচ্ছে, সেটি হলো চীন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “যে এআইয়ে জিতবে, বিশ্বে সে-ই জিতবে।” ট্রাম্পের মতে, এআইয়ের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে চীনের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে এবং এই নেতৃত্ব ভবিষ্যতেও ধরে রাখতে হবে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চীনসহ অন্য সব দেশের চেয়ে এগিয়ে আছে এবং সেই অবস্থান বজায় রাখার জন্য তার প্রশাসন কাজ করে যাবে। এআই নিয়ে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের যে দাবি উঠছে, সেটিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত আধিপত্যের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন। আমোদেইকে কটাক্ষ
এআই উন্নয়নের গতি কমানোর পক্ষে সাম্প্রতিক সময়ে সরব হয়েছেন অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই। তার আশঙ্কা, এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতি একসময় মানুষের নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে এবং মানবজাতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ট্রাম্প তার পোস্টে আমোদেইকে সরাসরি কটাক্ষ করেন। তিনি বলেন, তার প্রশাসন এআই খাতের মানুষদের এমন কিছু করা থেকে থামিয়েছে, যা ক্ষতিকর বা সম্ভাব্য ক্ষতিকর হতে পারে। আমোদেই এখন নিজেকে ‘নিখুঁত ভালো মানুষ’ হিসেবে উপস্থাপন করছেন বলেও ব্যঙ্গ করেন তিনি। তবে ট্রাম্পের দাবি, তার প্রশাসনের হাতে এআই কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ইতোমধ্যেই ব্যাপক ‘ফৌজদারি ও নিয়ন্ত্রক ক্ষমতা’ রয়েছে। এআই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র বিতর্ক ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্রে এআই নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত বিতর্ক তীব্র হয়ে উঠেছে। এআই খাতের কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তি সম্প্রতি প্রযুক্তিটির দ্রুত বিকাশ নিয়ে সতর্ক করেছেন। তাদের কেউ কেউ উন্নত এআই তৈরির গতি কমানো, স্বাধীন মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি একতরফাভাবে এআই উন্নয়নের গতি কমিয়ে দেয়, তাহলে চীন কৌশলগত সুবিধা পেয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে সামরিক প্রযুক্তি, সাইবার সক্ষমতা, অর্থনীতি ও বৈশ্বিক প্রভাবের ক্ষেত্রে এআই ভবিষ্যতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে ওয়াশিংটন। ফলে এআইয়ের নিরাপত্তা বনাম প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব—এই দুই অবস্থানের মধ্যে ভারসাম্য খোঁজা এখন মার্কিন নীতিনির্ধারকদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। ডেটা সেন্টার নিয়েও উদ্বেগ এআইয়ের দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে ডেটা সেন্টারের সংখ্যাও বাড়ছে। এসব কেন্দ্র পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও পানি প্রয়োজন হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় ডেটা সেন্টার নির্মাণ নিয়ে স্থানীয় জনগণের মধ্যে উদ্বেগ ও বিরোধ তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ খরচ বৃদ্ধি, পানির ব্যবহার এবং পরিবেশগত প্রভাবের পাশাপাশি এসব অবকাঠামো নির্মাণের ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণেই এআইবিরোধী বা এআই নিয়ন্ত্রণের দাবিতে থাকা বিভিন্ন পক্ষ ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণ নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। ট্রাম্প অবশ্য এই সমালোচনাকে বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেখছেন। যে এআইয়ে জিতবে, সে-ই জিতবে ট্রাম্পের বক্তব্যে এআইকে ঘিরে তার প্রশাসনের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিও স্পষ্ট হয়েছে। তার কাছে এআই কেবল একটি নতুন প্রযুক্তি নয়; এটি ভবিষ্যতের বৈশ্বিক ক্ষমতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা ইতোমধ্যে চিপ, সেমিকন্ডাক্টর, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ও এআইসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়েছে। ট্রাম্প মনে করছেন, এআইয়ে নেতৃত্ব হারালে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক ও সামরিক উভয় ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা হারাতে পারে।
তাই এআই উন্নয়নে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের পরিবর্তে প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব ধরে রাখার ওপরই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। সমালোচকদের জন্য কঠোর বার্তা নিজের পোস্টের শেষাংশে ট্রাম্প এআই নিয়ে সমালোচনাকারী এবং তথ্য ফাঁসকারীদের উদ্দেশে কঠোর সতর্কবার্তা দেন। তিনি ‘ষড়যন্ত্রতত্ত্বের প্রচারকারী’, ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’, ‘বিশ্বাসঘাতক’ ও ‘তথ্য ফাঁসকারীদের’ সতর্ক থাকতে বলেন।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, এআই নিয়ে বিতর্ককে তিনি শুধু প্রযুক্তি বা জননিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন না; বরং এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় শক্তি ও চীনের সঙ্গে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবেও বিবেচনা করছেন। এদিকে এআই শিল্পের ভেতর থেকেই যখন নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার দাবি জোরালো হচ্ছে, তখন ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে—এআইয়ের গতি কমিয়ে নয়, বরং নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা হাতে রেখে প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব ধরে রাখাই হবে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য। তবে এআই যত দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে, ততই সামনে আসছে মৌলিক প্রশ্নটি—মানবজাতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কতটা নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন, আর সেই নিয়ন্ত্রণের সীমাই বা নির্ধারণ করবে কে?
সূত্র: বিবিসি